গেমিং বিষয়টি বর্তমান দুনিয়ায় একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। গেমিং ইতিহাসের শুরুতে এটি ছিল নিছক আনন্দলাভ বা কালক্ষেপণের একটি বিষয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে গেমিং এর বিস্তৃতি যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি বেড়েছে এর জনপ্রিয়তা ও পরিধি। বর্তমানে শুধু আনন্দলাভের জন্যই আর বিভিন্ন ভিডিও গেম খেলা হয়না, অনেকের কাছে গেমিংই হলো জীবন। বিভিন্ন উন্নতমানের উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন কনসোল ব্যবহার করে গেমাররা বিভিন্ন ধরনের গেম খেলে থাকেন। বিশ্বজুড়ে নানা গেমিং কম্পিটিশনেও অংশ নিয়ে থাকেন গেমাররা যেখানে উন্নতমানের গেমিং কনসোলের উপরও নির্ভর করে পারফরমেন্স ।

একটা সময় পর্যন্ত গেমিং কম্পিউটার আর ছোটখাটো গেমিং ডিভাইসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও গেমিং জগতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে বিভিন্ন উচ্চমাত্রার প্রযুক্তি সম্পন্ন গেমিং কনসোল, যেগুলো শুধুমাত্র বড় পরিসর এবং উন্নত গ্রাফিক্স এর গেমগুলো খেলতে ব্যবহৃত হয়।

গেমিং জেনারেশন মূলত কনসোলের জেনারেশনের উপর ভিত্তি করেই ধরা হয়। বিশ্বের বেশ কিছু বৃহদায়তন প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গেমিং কনসোলের বিশ্বব্যাপী বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, যেগুলোর মধ্যে ‘মাইক্রোসফট’, ‘সনি’, ‘নিনটেনডো’ ইত্যাদি  উল্লেখযোগ্য। আর একটি গেমিং কনসোলের কার্যকারিতা ও জনপ্রিয়তা শুধু এর উন্নত প্রযুক্তির উপরই নির্ভর করে না, বরং কতগুলো গেম কনসোলটিতে সাপোর্ট করে, কতগুলো গেম একটি নির্দিষ্ট কনসোলে খেলার উপযোগী করে বানানো হয় তার উপরও নির্ভর করে থাকে।

বর্তমানে বেকিছু উন্নত গেমিং কনসোল বিশ্ববাজারের পাশাপাশি বাংলাদেশেও পাওয়া যায়। এই আর্টিকেলটি তে ৫ টি উন্নতমানের কনসোল নিয়ে আলোচনা করা হবে যেগুলো গেমিং এর জগতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। কনসোলগুলো হলো-

এক্সবক্স ওয়ান; ছবি: techradar.com

১. এক্সবক্স ওয়ান (Xbox One):

মাইক্রোসফটের গেমিং কনসোল সিস্টেমের সর্বশেষ সংযোজন হলো এক্সবক্স ওয়ান। অত্যন্ত উচ্চমান ও প্রযুক্তিসম্পন্ন কনসোলটি তে রয়েছে হাই গ্রাফিক্স ও স্টোরেজ। এর সাথে রয়েছে নতুন কাইনেক্ট সেন্সর ও রিডিজাইনড গেমপ্যাড। শুধু গেমই নয়, বরং একই সাথে লাইভ টিভি, অনলাইন মুভি, ভিডিওকল ইত্যাদি সব সেবাই পাওয়া যাবে এই কনসোলে। ইন্টারনেট ব্যবহার আরো সুবিধাজনক করা হয়েছে এটিতে। গেমপ্লে আরও উন্নত হয়েছে এবং গেমপ্যাডে ভাইব্রেটিং ফিডব্যাক ফিচারটি যুক্ত হয়েছে।

বিভিন্ন ফিচার যুক্ত করায় এনিমেশনের মান ১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পূর্বের ভার্সন এক্সবক্স ৩৬০ এর তুলনায় ক্যালকুলেশনও দ্রুততর হয়েছে। বাংলাদেশে এক্সবক্স ওয়ান সহজলভ্য এবং বর্তমানে এর বাজারমূল্য হচ্ছে প্রায় ২১ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত, যা বিভিন্ন ভার্সনের উপর নির্ভর করে।

২. প্লে-স্টেশন ফোর(PS4):

‘সনি ইন্টেরাক্টিভ এন্টারটেইনমেন্ট’ বা সংক্ষেপে ‘সনি’ এর  গেমিং কনসোল সিস্টেমের সর্বশেষ সংযোজন হলো প্লে-স্টেশন ফোর বা পিএস ফোর। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন কনসোলটিতে রয়েছে হাই গ্রাফিক্স ও স্টোরেজ। ২০১৪ সালে অষ্টম প্রজন্মের এই গেমিং কনসোলটি বাজারে আসে।

সহজে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা ছাড়াও আরও নানা উন্নত ফিচার রয়েছে এই কনসোলটিতে। গেমপ্যাডটিতে রয়েছে ভাইব্রেটিং ফিডব্যাক ফিচার। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সবচেয়ে অধিক ব্যবহৃত গেমিং কনসোল পিএসফোর। প্রায় সকল বিখ্যাত গেমেরই পিএসফোর ভার্সন বের হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ভার্সনভেদে এই কনসোলের দাম পড়বে ২৩-৩৫ হাজার টাকা।

পিএসফোর; ছবি: cnet.com

৩. নিনটেনডো সুইচ:

সনি ও মাইক্রোসফট, এই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই মূলত বিগত দুই দশক ধরে প্রতিযোগিতা হয়েছে গেমিং কনসোল তৈরিতে। এই দুই প্রতিষ্ঠানের আগ্রাসনে অনেকটা ঢাকা পড়ে যাচ্ছিলো আরেক বিখ্যাত কনসোল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘নিনটেনডো’। বেশ কয়েকবছর ধরেই নিনটেনডো বাজারে আকর্ষণীয় কিছু আনতে পারছিল না। ফলে, ধরে নেয়া হচ্ছিল ‘সেগা’ সহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের মত হারিয়ে যাবে নিনটেনডোও।

কিন্তু সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি বাজারে নিয়ে আসে তাদের সর্বাধুনিক গেমিং কনসোল ‘নিনটেনডো সুইচ’। এতে ব্যবহৃত হয়েছে ১.০২ গিগাহার্টজের কোয়াডকোর প্রসেসর, ৪ জিবি র‍্যাম, ৩২ জিবি স্টোরেজ, নিজস্ব সফটওয়্যার সহ আরো অনেক কিছু। ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধাও যোগ করা হয়েছে এতে। বাংলাদেশে এর দাম পড়বে প্রায় ২৭০০০ টাকার মতো।

নিনটেনডো সুইচ; ছবি: bigw.com.au

৪. প্লে-স্টেশন ৩(PS3):

পূর্বে আলোচিত প্লেস্টেশন ৪ এর আগের ভার্সন হলো প্লেস্টেশন ৩। সনি কম্পিউটার এন্টারটেইনমেন্ট ২০০৬ সালে তাদের সপ্তম প্রজন্মের গেমিং কনসোল হিসেবে বাজারে নিয়ে আসে পিএসথ্রি। ২০ জিবি ও ৬০ জিবি, দুই ধরনের পিএসথ্রি মডেল আসে বাজারে। ৫৫০ মেগাহার্টজ গ্রাফিক্স কার্ড ও ২৫৬ মেগাবাইট র‍্যাম সুবিধা রয়েছে পিএসথ্রি তে।

ব্লু-রে ও ডিভিডি ডিস্ক ছাড়াও পিএসওয়ান ও পিএসটু এর ডিস্কও এতে কাজ করে। বর্তমানে সনি পিএসথ্রি বাজারজাত করা বন্ধ করে দেয়ায় বাংলাদেশে সেকেন্ডহ্যান্ড ছাড়া আর এই কনসোলটি পাওয়া যায়না।

৫. কাইনি এক্স প্রো ৮০০(Kinney X Pro 800):

কাইনি এক্স প্রো ৮০০ মূলত একটি টিভি গেমিং কনসোল, যা এইচডিএমআই পোর্টের সাহায্যে টিভির সাথে যুক্ত থাকে। এতে রয়েছে লিনাক্স ৩.০ অপারেটিং সিস্টেম, ৪ জিবি র‍্যাম, ৩২ জিবি পর্যন্ত সাপোর্টেড স্টোরেজ এবং অনেকগুলো ভাষায় ব্যবহারের সুবিধা। এর গেমিং স্পিড আউটপুট এফপিএস ১:১। এছাড়াও এতে প্রায় ৮০০ টির মতো ছোট বড় ক্লাসিক গেম আগে থেকেই ইনস্টল করা থাকে। এর দাম পড়বে প্রায় ৮৫০০ টাকার মতো।

কাইনি  এক্সপ্রো ৮০০; ছবি: youtube.com

বর্তমানে গেমারদের কাছে গেম খেলার জন্য কম্পিউটারের চেয়ে গেমিং কনসোল সমূহই অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। আর এসকল কনসোলে গেমিং যেমন আরামদায়ক ও সুবিধাজনক, দামও তেমন হাতের নাগালের মধ্যেই। বর্ণিত এসব কনসোল ব্যবহারের মাধ্যমে একজন গেমার তার গেমিং এক্সপেরিয়েন্সের ক্ষেত্রে যোগ করতে পারেন নতুন মাত্রা।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *