আয়রনম্যান মুভি তে আয়রনম্যানের ‘জার্ভিস’ নামক  আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাসিস্ট্যান্ট কে দেখে সবারই হয়তো মনে হয়েছে এমন একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকলে মন্দ হতো না! নানা উন্নত প্রযুক্তি এবং অ্যান্ড্রয়েড ও অন্যান্য অপারেটিং সিস্টেম ভিত্তিক স্মার্টফোনসহ অন্যান্য ছোট ডিভাইস আবিষ্কারের পরপরই ধারণা আসে স্মার্ট হোম ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টের। আর এমন একটি সহকারী যেকারো বাসস্থানকে এনে দিতে পারে গতিশীলতা।

অ্যালেক্সা ও ইকো; Image Source: pcmag.com

শুধু মুখে যেকোনো কিছুর ভয়েস ইন্সট্রাকশন দেয়া মাত্রই সেই কাজ করে হোম ভয়েস এসিস্ট্যান্ট। এগুলো সম্পূর্ণরূপে প্রযুক্তিভিত্তিক এবং ঘরের সকল ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেটের সাথে কানেক্টেড থাকে। আর কানেক্টেড থাকায় কোনোরকম সংস্পর্শ ছাড়াই মুখে আদেশ দিয়ে এসকল গ্যাজেট কে বিভিন্ন কাজের নির্দেশনা দেয়া যায়, বিভিন্ন বিষয় জানতে চাওয়া যায় এদের কাছে।

বিভিন্ন ধরনের অপারেটিং সিস্টেম বিভিন্ন অ্যাসিস্ট্যান্ট বাজারে আনছে বর্তমানে, তার মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় দুটি স্মার্ট হোম অ্যাসিস্ট্যান্ট হলো ‘অ্যামাজন ইকো’’ বা ‘অ্যালেক্সা’ এবং ‘গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট’ বা ‘গুগল হোম’। এই দুটির তারতম্য নিয়েই আলোচনা করবো আজ।

অ্যামাজন ইকো এবং গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট উভয়েই অত্যন্ত আধুনিক ও উন্নতমানের। এ দুটোরই বেশ কিছু স্বতন্ত্র ফিচার রয়েছে। অ্যালেক্সা’র যেমন একাধিক ‘ওয়েক ওয়ার্ড বা ফ্রেজ’ রয়েছে, আবার অন্যদিকে গুগল হোমের রয়েছে ইচ্ছামতো নিজস্ব মিউজিক তৈরি করে ক্লাউডে আপলোড করার সুবিধা।

Image Source: pcmag.com

অ্যালেক্সা এর কনফিগারেশন, ইনফর্মেশন সোর্স, থার্ড পার্টির সাথে কানেক্টিভিটি অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি। কিন্তু এটি ব্যবহার একটু। কঠিন কারণ নির্দিষ্ট শব্দগুচ্ছ মনে রেখে এগুলো ব্যবহার করে বারবার নির্দেশ দিতে হয়। অন্যদিকে গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহার সহজতর, ঝামেলা কম এবং সহজে বিভিন্ন নতুন বিষয়ের সাথে মানিয়ে নিতে পারে। গুগলের স্পিকার গুলোর সাউন্ড অপেক্ষাকৃত উন্নত, কিন্তু ইকোও এ বিষয়ে দিন দিন উন্নতি করছে।

অ্যামাজন ইকো এর সর্বশেষ ভার্সনটি দেখতে অনেক বেশী চিত্তাকর্ষক। এটি ৬ ইঞ্চি লম্বা একটি মোটা ও খাটো সিলিন্ডার, যা ঘরের ডিজাইনের সাথে সুন্দরভাবে মানিয়ে যাওয়ার জন্য কাঠের অথবা বিভিন্ন রঙের কাপড়ে মোরা থাকে। এর দুটি বাটন রয়েছে যার একটি দিয়ে মাইক্রোফোন অফ করা হয়, অন্যটি দিয়ে বেশ কয়েকটি কাজ করা যায়। অ্যালেক্সা অ্যাক্টিভেটেড হলে এর উপরের অংশের ভলিউম রিংয়ে লাইট জ্বলে।

Image Source: theverge.com

অন্যদিকে গুগল হোম দেখতে সাদা এবং ৫.৬ ইঞ্চি লম্বা ও ৩.৮ ইঞ্চি ব্যাস যুক্ত। সাতটি ভিন্ন রঙের ধাতব বেজ ও পরিবর্তনযোগ্য কাপড় লাগানো থাকে এতে। গুগল হোমের নন্দনতত্ত্বের অনুপ্রেরণা এসেছে মোমবাতি ও ওয়াইন গ্লাসের ডিজাইন থেকে, যার ফলে এর উপরের অংশ মসৃণ, শক্ত প্লাস্টিকে তৈরি যাতে চারটি ভিন্ন রঙের এলইডি লাইট জ্বলে, যখন এটি কথা শুনতে থাকে।

এতে টাচ ইন্টারফেস রয়েছে যা দিয়ে ভলিউম চেঞ্জ, মিউজিক প্লে বা পজ এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাক্টিভেট করা যায়। এর সাথে রয়েছে একটি মিউট বাটন। দুটির ডিজাইন কাছাকাছি প্রকৃতির হলেও অ্যালেক্সা’র ডিজাইন বেশ ঘরোয়া প্রকৃতির। কারণ, এর রঙ ঘরের ডিজাইনের সাথে সহজে মিশে যেতে পারে গুগল হোমের তুলনায়। অন্যদিকে গুগল হোমে বেশি জোর দেয়া হয়েছে নন্দনতত্ত্বে।

অ্যালেক্সা ও গুগল হোমের  স্মার্ট হোম ব্র‍্যান্ড পার্থক্য অনেক কমে এসেছে। ‘ব্লিংক’ ও ‘রিং’ এর মালিকানা অ্যামাজনের, তাই এ দুটি শুধু অ্যালেক্সায় কাজ করে। আর ‘নেট’ এর মালিকানা গুগলের হওয়ায় নেট অ্যালেক্সার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছে।

এ দুটি হোম অ্যাসিস্ট্যান্টই বাসার সবগুলো রুমের বিভিন্ন ডিভাইসের মধ্যে কানেকশন স্থাপন করে থাকে এবং শুধু ভয়েস নির্দেশনা নিয়েই এসকল ডিভাইস কন্ট্রোল করা যায়। যেমন- যেকোনো রুম থেকে লিভিং রুমের সবগুলো লাইট জ্বালিয়ে দেয়া যাবে। আর রুটিন সেট করে রাখা যায়, যাতে একাধিক কাজ একটি নির্দেশনার মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায়।

Image Source: techcrunch.com

টেলিভিশনের সাথে গুগল হোম ও অ্যালেক্সা উভয়েই কানেক্ট করে এবং শুধু ভয়েস নির্দেশের মাধ্যমেই টিভি চালানো ছাড়াও নেটফ্লিক্স, হুলু ইত্যাদি চ্যানেল চালু করা যায়। তবে গুগল হোমের একটু সুবিধা বেশি ইউটিউব গুগলের মালিকানাধীন হওয়াতে, যে কারণে অ্যালেক্সা ইউটিউব প্লে করতে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়।

এই দুটি অ্যাসিস্ট্যান্টই ওয়াইফাই কানেকশনের সাহায্যে চললেও ইকো এর ওয়াইফাই কানেক্টিভিটি পাওয়ার তুলনামূলক বেশি। কারণ, হোম দুর্বল সিগন্যাল ধরতে পারে না তেমন। অ্যালেক্সা তে বিভিন্ন থার্ড পার্টি স্কিলস রয়েছে, যেমন- লোকাল বাস সিস্টেম, খেলাধুলার পরিসংখ্যান ইত্যাদি জানা। গুগলের এসব স্কিল কম হলেও বেশি আকর্ষণীয়, যেমন- ডমিনোস থেকে খাবার অর্ডার করা অথবা উবার থেকে গাড়ি কল করা ইত্যাদি।

এছাড়াও গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট ও অ্যালেক্সা উভয়ের সাহায্যেই যেকোনো জায়গায় ফোন করা যায়। অন্যদিকে, গুগল হোম ইনকামিং কল রিসিভিং সাপোর্ট না করলেও ইকো ডিভাইস থেকে আসা ফোনকল রিসিভ করা যায় অ্যালেক্সার সাহায্যে। ইকো কানেক্ট বক্স ব্যবহার করলে এটি হোম লাইন এর ফোনকল রিসিভ করতে পারে। আর দুটি অ্যাসিস্ট্যান্টেই ভয়েস রিকগনিশন রয়েছে। ফলে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ভয়েস শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একাউন্ট সুইচ করতে পারে এরা।

ভয়েস এক্টিভেশন কন্ট্রোল দুটি অ্যাসিস্ট্যান্টেই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ইকো তে শুধু নারী ভয়েস থাকলেও গুগল হোমে নারী-পুরুষ উভয় কণ্ঠই রয়েছে। যতগুলো হোম স্মার্ট ডিভাইস রয়েছে সবগুলো কন্ট্রোলের পাশাপাশি ইচ্ছামতো মিউজিক প্লে অথবা  অনলাইন সার্চ করা যায়।

এছাড়াও এদের কিছু ওয়েক আপ বা এক্টিভেশন ওয়ার্ড রয়েছে। অ্যালেক্সা ‘অ্যামাজন’, ‘ইকো’, ‘অ্যালেক্সা’ ইত্যাদি সাপোর্ট করলেও গুগল শুধু ‘হেই গুগল’ বললেই সাড়া দেয়। আবার অনলাইন সার্চের ক্ষেত্রে গুগল হোম অনেক এগিয়ে। কারণ, যেকোনো সার্চে গুগলের বিশাল তথ্যভান্ডার থেকে হোম তথ্য সরবরাহ করে, যেখানে অ্যালেক্সা মূলত উইকিপিডিয়ার উপরই নির্ভর করে থাকে।

হোমে ইচ্ছামতো শব্দ ব্যবহার করে কনভার্সেশন ও অনুসন্ধান করা গেলেও অ্যালেক্সা তে কিছু নির্দিষ্ট সেটের বাইরে শব্দ ব্যবহার করা যায়না। অন্যথায় সঠিক ফল পাওয়া যায়না। দুটিরই শব্দের বানান বলে দেয়া, খবর পড়িয়ে শোনানো, টাইমার সেট করা ইত্যাদি করলেও হোমের সাথে কথোপোকথন বেশি করা যায়। তবে অ্যালেক্সা শপিং বিষয়ক যেকোনো তথ্য দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে রয়েছে।

সাউন্ড সিস্টেমের ক্ষেত্রে ইকো ও হোম উভয়েই উন্নত হলেও হোমের সাউন্ড বেশি জোরালো। এবং উভয়েই স্পটিফাই, প্যান্ডোরা সহ অনেক মিউজিক স্ট্রিমিং সাইট সাপোর্ট করে এবং উভয়ের আলাদা এক্সক্লুসিভ সাইট রয়েছে। হোমে নিজস্ব মিউজিক ক্লাউডে আপলোড করার সুবিধা থাকলেও ইকো তে সেই সুবিধা নেই। আবার ইকো তে এক্সটারনাল স্পিকার লাগানো গেলেও হোমে সেই সুবিধা নেই।

অ্যালেক্সা ও গুগল হোম উভয়েরই বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় উভয়েরই বেশ ভালো কিছু দিক রয়েছে এবং বিভিন্ন বিষয়ে এরা একে অপরের তুলনায় এগিয়ে। কাজেই এরা একটি অপরটির চেয়ে তেমন পিছিয়ে নেই। ব্যবহারকারী তার প্রয়োজনমাফিক মূল চাহিদার উপর জোর দিয়ে যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন নির্দ্বিধায়।

ফিচার ছবি- pcmag.com

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *