বেশিদিন আগের কথা নয় যখন চলচ্চিত্রপাড়ায় ভিডিও ধারণ করার জন্য যেসব ক্যামেরা ব্যবহার করা হতো, সেগুলো ২৫ থেকে ৩০ এফপিএস (ফ্রেম পার সেকেন্ড) পর্যন্ত ফুটেজ ধারণ করতে পারতো। অথচ, প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে ক্যামেরার অগ্রগতি এতদূর পৌঁছেছে যে এখনকার ভিডিও ক্যামেরাগুলো অনায়াসে ৬০ এফপিএসে ভিডিও ধারণ করতে পারে, যা সিনেমা এডিটিংকে করছে আরো সমৃদ্ধ, খুলে দিচ্ছে চমকপ্রদ সব এডিটিং সম্ভাবনার দুয়ার।

Image Source: DivePhotoGuide.com

অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ব্ল্যাকম্যাজিক ডিজাইন কোম্পানি চলতি বছর বাজারে এনেছে তাদের ব্ল্যাকম্যাজিক ক্যামেরা সিরিজের হালনাগাদ সংস্করণ, ব্ল্যাকম্যাজিক পকেট সিনেমা ক্যামেরা সিক্স কে (বিএমপিসিসি ৬কে)। আর এই ক্যামেরাটির ভিডিও ধারণ সক্ষমতা ১২০ এফপিএস পর্যন্ত! সিনেমাজগতে ১২০ এফপিএস অপরিচিত নয়। হলিউডের কোনো সাইফাই কিংবা অ্যাকশন সিনেমার ইন্টেন্স কোনো দৃশ্য ধারণ করতে ১৫০ এফপিএস ক্যামেরা অহরহই ব্যবহৃত হচ্ছে।

কিন্তু, বিএমপিসিসি’র বিশেষত্ব হলো এটি ঐসব বড় আকারের ভিডিও ক্যামেরার মতো ট্রাইপড নিয়ে বহন করে বেড়াতে হবে না। সাধারণ ডিএসএলআর ক্যামেরার মাঝে এমন উচ্চমানের এফপিএস অসামান্য ব্যাপার।

বডি

ব্ল্যাকম্যাজিক সিরিজের আগের সংস্করণ পকেট ৪কে’র সাথে সর্বশেষ সংস্করণ পকেট ৬কে’র পার্থক্য খুব বেশি নেই। প্রধান্য পার্থক্য ক্যামেরার মধ্যখানে মাউন্টটি, যেটি ৬কে’তে আগের চেয়ে কিছুটা বড়। এর কারণ, আগের সংস্করণটিতে ব্যবহৃত হয়েছিল মাইক্রো ফোর-থার্ড লেন্স। আর এই সংস্করণে ব্যবহার করা হয়েছে ক্যাননের ইএফ ডিএসএলআর গ্লাস, যার আকৃতি তুলনামূলকভাবে বড়। তাছাড়া, এর সেন্সরটিও আগের সংস্করণের তুলনায় বড় এবং লেন্স থেকে অধিক দূরত্ব পর্যন্ত বিস্তার লাভ করতে পারে।

Image Source: cinema5d.com

মিররলেস ক্যামেরা যাদের পছন্দ, তাদের কাছে মনে হতেই পারে যে ক্যাননের ইফ গ্লাস ব্যবহার না করে ইওএস আর গ্লাস ব্যবহার করলে ক্যামেরাটি আরো সম্পূর্ণতা পেত। কিন্তু, নির্মাতারা ক্যামেরাটিকে মানসম্মত করার পাশাপাশি বাজেটের কথাও মাথায় রেখেছেন। ইওএস আর গ্লাস ব্যবহারে এর বাজেট অনেকখানি বেড়ে যেত। অথচ ইএফ গ্লাস ব্যবহারে মানের ক্ষেত্রেও এটি খুব বেশি পিছিয়ে পড়েনি ক্যামেরাটি।

পেশাদার সিনেমা নির্মাতাদের জন্য ব্যবহারযোগ্য এই ক্যামেরার সেরা দিকটি হলো এর সহজবোধ্যতা। যেকোনো প্রো-লেভেল মিররলেস ক্যামেরার ব্যবহারবিধি আয়ত্ত করতে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় লেগে যায়। কিন্তু, এই ক্যামেরাটির ব্যবহারবিধি আয়ত্ত করতে আধা ঘন্টার বেশি সময় লাগবে না।

পকেট ৪কে’র সাথে পকেট ৬কে’র তুলনা; Image Source: simonmcguire.net

এটি সম্ভব হয়েছে এর এরগোনমিক ডিজাইন, ব্যবহার বান্ধব টাচস্ক্রিন এবং ফলো-আপ মেনু সিস্টেমের কারণে। যেকোনো ধরনের সেটিংস এর ৫ ইঞ্চি স্মার্ট ডিসপ্লে থেকে অত্যন্ত সহজেই পরিবর্তন করা যাবে। ব্যাপারটা অনেকটা স্মার্টফোনের সেটিংস পরিবর্তন করার মতই। অন্যদিকে অ্যাপারচার, আইএসও, শাটার স্পিড, ইত্যাদির মতো মৌলিক সেটিংসগুলো বাটনের সাহায্যেই পরিবর্তন করা যাবে।

ব্যাটারি, কানেক্টর ও স্টোরেজ

কানেক্টরের ক্ষেত্রে পকেট ৬কে ক্যামেরাটি অনায়াসে বাজারের যেকোনো মিররলেস ক্যামেরার চেয়ে এগিয়ে। মিররলেস ক্যামেরাগুলোয় একটিমাত্র অডিও চ্যানেল থাকে সাধারণত। অথচ পকেট ৬কে’তে একটি ৩.৫ মিলিমিটার হেডফোন ও মাইক্রোফোন কানেক্টর থাকার পাশাপাশি একটি মিনি-এক্সএলআর মনোলক কানেক্টরও আছে, যা উচ্চমানের প্রফেশনাল মাইক সংযোগ করা যাবে। আরো তো আরো, উভয় পোর্টে একইসাথে দুটি ডিভাইস সংযোগ করা যাবে ব্যাক আপের জন্য।

রেকর্ডিং এর জন্য একটি পূর্ণমাত্রার এইচডিএমআই পোর্টের পাশাপাশি এতে রয়েছে একটি টাইপ সি ইউএসবি পোর্ট এবং চমৎকার স্টেরিও স্পিকারও।

পকেট ৬কে ক্যামেরায় যদি একটি হতাশার জায়গা থেকে থাকে, তাহলে সেটি হবে ব্যাটারি। ক্যামেরার ম্যানুয়াল অনুযায়ী এটি ৫০ ভাগ ব্রাইটনেসে ৬কে ক্যামেরায় মাত্র ৪৫ মিনিট ভিডিও ধারণ করা যাবে। অথচ, বাস্তবে তা আধা ঘন্টাও হয় না। অবশ্য, ক্যানন এলপি-ই৬ ব্যাটারিগুলো অত্যন্ত সাশ্রয়ী হওয়ায় খুব বেশি ভাবতে হয় না। একসাথে অনেকগুলো ব্যাটারি কিনে নিলেই আর সমস্যা থাকছে না।

এফপিএস

মিররলেস ক্যামেরার জগতে এফপিএসের জন্য পকেট ৬কে নিঃসন্দেহে সেরা। এফপিএসে এটি সাধারণ মিররলেস ক্যামেরাগুলোকে তো অনায়াসেই হারিয়ে দেয়, পাল্লা দেয় প্রফেশনাল সিনেমা ক্যামেরাগুলোর সাথেও। পকেট ৬কে বাদে মিররলেস ক্যামেরার মধ্যে প্যানাসনিকের ৪ হাজার ডলার মূল্যের এস১এইচ সর্বোচ্চ ৫.৯কে রেজ্যুলেশন দিতে পারে।

এর বাইরে এরূপ উচ্চ রেজ্যুলেশনের জন্য যেতে হবে রেড, অ্যারি কিংবা সনির সিনেমা ক্যামেরাগুলোর কাছে যেগুলোর মূল্য ২০ হাজার ডলার বা ততোধিক। অথচ পকেট ৬কে একই মানের রেজ্যুলেশন দিচ্ছে মাত্র ২৫০০ ডলারে!

আগের সংস্করণের সাথে রয়েছে আকারের পার্থক্যও; Image Source: reddit.com

বিএমপিসিসি ৬কে ক্যামেরার বিভিন্ন এফপিএসে রেজ্যুলেশনের মান একনজরে দেখে নেয়া যাক-

  • ৫০ এফপিএস; রেজ্যুলেশন- ৬১৪৪ × ৩৪৫৬ ১৬:৯
  • ৬০ এফপিএস; রেজ্যুলেশন- ৬১৪৪ × ২৫৬০ ২.৪:১
  • ১২০ এফপিএস; রেজ্যুলেশন- ২.৮ কে ২৮৬৮ × ১৫১২ ১৭:৯

পারফরম্যান্স

পকেট ৬কে’তে অবিচ্ছিন্ন অটোফোকাস, আই-ট্র্যাকিং, স্ট্যাবিলাইজেশন কিংবা অন্যান্য বেশকিছু স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নেই। ফলে, এটি সাধারণ ফটোগ্রাফারদের ব্যবহারের জন্য সুবিধাজনক ক্যামেরা নয়। অটোফোকাসের জন্য একটি বাটন থাকলেও তা ভালো আলোতেই কেবল কাজ করে। তবে, ক্যামেরাটি মূলত ম্যানুয়াল ফোকাসের জন্যই তৈরি।

এক্সপোজারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অটো-এক্সপোজারের অপশন থাকলেও ক্যামেরাটি আদতে ম্যানুয়ালের জন্য ডিজাইন করা। স্বয়ংক্রিয় ফোকাস এবং এক্সপোজারের জন্য সনি কিংবা ক্যাননই সেরা।

সিনেমার নির্মাণের জন্য এই ক্যামেরা জুতসই; Image Source: DIGI TECH Trading LLC

পকেট ৬কে ক্যামেরার শ্রেষ্ঠত্ব ভিডিও করায়। বলা চলে, উঠতি চলচিত্র নির্মাতাদের জন্য বাজেটের মধ্যে এটিই সেরা ক্যামেরা। এই ক্যামেরায় ৬কে রেজ্যুলেশনে ফুটেজ ধারণ করলে তার নয়েজ লেভেল যথেষ্টই কম হয়। আর এর ডুয়েল আইএসও সেন্সর অল্প আলোকেও চমৎকার পারফরম্যান্স দেয়। ৬কে তে ধারণকরা ফুটেজগুলো বাজারের অন্যান্য মিররলেস ক্যামেরার তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও অধিক শার্পনেস দিতে সক্ষম।

সব মিলিয়ে, ব্ল্যাকম্যাজিক পকেট সিনেমা ক্যামেরা ৬কে সাশ্রয়ী মূল্যে অতুলনীয় একটি ডিভাইস। এই ক্যামেরা ফটোগ্রাফি কিংবা ফটোগ্রাফারদের জন্য নয়। সাধারণ ইউটিউবার কিংবা শখের ভিডিও নির্মাতাদের জন্যও এই ক্যামেরা নয়। এটি সিনেমা তৈরিতে ইচ্ছুক প্রফেশনালদের জন্য, বিশেষকরে যাদের বাজেট সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য।

বাংলাদেশের বাজারে এখনো আসেনি ক্যামেরাটি, তবে শীঘ্রই আসবে। বাংলাদেশে এর দাম ৩ লক্ষের অধিক হতে পারে। তবে আগ্রহীরা চাইলে অ্যামাজন থেকে এখনই কিনে ফেলতে পারেন। অ্যামাজন থেকে কিনলে এর দাম পড়বে ২ লক্ষ ৬০ হাজার টাকার মতো।

ফিচার ছবি: petapixel.com

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *