ছবি তুলতে পছন্দ করেন না এমন মানুষ বর্তমান যুগে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বন্ধুবান্ধবের আড্ডা থেকে শুরু করে যেকোনো অনুষ্ঠানে অথবা ঘুরতে গেলেও ছবি উঠানোর কাজটি চলতেই থাকে, যাতে স্মৃতি ধরে রাখা যায়। আর বিভিন্ন ছবিভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ইন্সটাগ্রাম, ফেসবুক, স্ন্যাপচ্যাট ইত্যাদির যুগে মানুষের মধ্যে ছবি তোলার আগ্রহ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।

আজকাল ছবি অনেক ধরণের ডিভাইসে তোলা যায়, আর স্মার্টফোনের আবির্ভাবের কারণে ছবি তোলা হয়েছে আগের চেয়ে অনেক সহজ। যে কেউ যেকোনো স্থানে ছবি তুলতে পারেন হাতে একটি স্মার্টফোন থাকলেই। কিন্তু স্মার্টফোন ক্যামেরার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে চাইলেই সবসময় মনমতো ছবি তোলা যায়না। আর ছবি সকলেই শুধু নিছক আনন্দের বশে তুলে থাকেন না, এটা অনেকের পেশাও।

তাই মনের মতো ছবি তোলার জন্য তাদের প্রয়োজন হয় সত্যিকারের ছবি তোলার ডিভাইস, একটি ডিএসএলআর ক্যামেরা। উচ্চমাত্রার রেজ্যুলেশনের কারণে ডিএসএলআর ক্যামেরা দিয়ে মনমতো ভালো মানের ছবি তোলা যায় যেকোনো আলোতে। ছবি তোলা একটি শিল্প, আর এই শিল্পকে গুরুত্ব সহকারে সম্পন্ন করতে ডিএসএলআরের বিকল্প নেই।

বিশ্বজুড়ে অনেক ভালো ভালো ব্র্যান্ড যেমন সনি, ক্যানন, নিকন ইত্যাদির ডিএসএলআর ক্যামেরা রয়েছে বাজারে। প্রত্যেকটি ব্র্যান্ডেরই অসংখ্য মডেলের ক্যামেরা রয়েছে যেগুলো দিয়ে খুব ভালো ছবি তোলা যায়। আর প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে নতুন নতুন ফিচারযুক্ত ক্যামেরা প্রতিবছরই আসছে বাজারে। এমনই একটি ক্যামেরার মডেল হলো ‘ক্যানন ইওএস ৫ডি মার্ক থ্রি’। এই মডেলটি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দিয়েই সাজানো হয়েছে এই লেখাটি।

ক্যানন বিশ্বের অন্যতম একটি জনপ্রিয় ক্যামেরা ম্যানুফ্যাকচারার ব্র্যান্ড; ছবি: nofilmschool.com

জাপানিজ ক্যামেরা ম্যানুফ্যাকচারিং ব্র্যান্ড ক্যানন ১৯৮৭ সালে তাদের প্রথম ‘ইওএস’ প্রযুক্তির ক্যামেরা বাজারে নিয়ে আসে। এসময় বাজারে আসে ক্যানন ইওএস ৬৫০ যাতে ছিলো ৩৫ মিলিমিটার অটোফোকাস সিঙ্গেল লেন্স রিফ্লেক্স। সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক লেন্স মাউন্ট, ইন-লেন্স এপারচার এবং ফোকাস মোটর, ইলেকট্রনিক বাটন ও ডায়াল অপারেশনের উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি ইত্যাদি পরিবর্তনের মাধ্যমেই বাজারে আসে এই নতুন প্রজন্মের ক্যামেরা, যার ধারাবাহিকতায় একসময় বাজারে আসে ক্যানন ইওএস ৫ডি মার্ক থ্রি।

আর ক্যাননের ৫ডি পরিবারের ডিএসএলআর ক্যামেরাগুলো উন্নত প্রযুক্তির ক্যামেরার ক্ষেত্রে যুগান্তর ঘটিয়েছে। ক্যাননের ৫ডি ক্যামেরাগুলোর আগমনের শুরু থেকেই নানা নতুন নতুন ফিচার নিয়ে হাজির হতে থাকে, যেগুলোর মধ্যে ফুল ফ্রেম সিঙ্গেল লেন্স রিফ্লেক্স, সম্পূর্ণ এইচডি ভিডিও ধারণ করার ক্ষমতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

ক্যানন ইওএস ৫ডি মার্ক থ্রি; ছবি: usa.canon.com

ক্যানন ইওএস ৫ডি মার্ক থ্রি ক্যামেরাটির সেরা ফিচারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো এর ফুল ফ্রেম সিএমওএস সেন্সর যা উচ্চ মাত্রার রেজোল্যুশন তৈরিতে সাহায্য করে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত নাড়াচাড়া ও আলোর মধ্যেও ভালো ছবি তুলতে সাহায্য করে।

২২.৩ মেগাপিক্সেল রেজ্যুলেশনের লেন্স ব্যবহৃত হয়েছে এতে। ফটোইলেক্ট্রিক কনভার্সন রেট বাড়িয়ে সেন্সর গুলোর কর্মক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে এতে একটি নতুন ফটোডায়োড স্ট্রাকচার যুক্ত করা হয়েছে। আর এতে প্রসেসর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ডিজিআইসি ৫+ ইমেজ প্রসেসর, যা ক্যামেরার প্রসেসিং গতি কে অনেক বাড়িয়ে দেয় এবং যেকোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে আনতে সহায়তা করে।

লেন্স হিসেবে এই ক্যামেরায় ব্যবহৃত হয়েছে ক্যানন ইএফ লেন্স এবং মাউন্ট হিসেবে রয়েছে ইএফ মাউন্ট। আর স্টোরেজ সুবিধা হিসেবে রয়েছে ৫ টি বিভিন্ন ধরনের মেমোরি কার্ড, যেগুলো ফটোগ্রাফার নিজের সুবিধামতো যেকোনো ধরনের কার্ড ব্যবহার করতে  পারেন।

লেন্সের এসপেক্ট রেশিও ৩:২, যা উল্লম্ব অবস্থায় বিদ্যমান। সেলফ ক্লিনিং সেন্সর ইউনিট এর মাধ্যমে অটোমেটিক সেন্সর ক্লিনিং কাজ করে ক্যামেরার লেন্সে। নিজে নিজেই লেন্সের ডাস্ট পরিষ্কার হয় এই সেন্সরের কারণে এবং অবলোহিত ও অতিবেগুনি রশ্মি ব্লকিং গ্লাসের মাধ্যমে ডাস্ট ক্লিনিং প্রক্রিয়াটি ঘটে।

বিভিন্ন ফরম্যাটের ভিন্ন ভিন্ন রেজ্যুলেশনের ছবি তোলা যায় এই ক্যামেরা দিয়ে। আর রেজ্যুলেশনের উপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন সাইজের ছবি উঠানো যায়। এছাড়াও আলোর স্বল্পতা ও অন্যান্য বিষয়ের উপর নির্ভর করে ইচ্ছামতো হোয়াইট ব্যালেন্স সেট করা যায়।

এই ক্যামেরাটির অটোফোকাস কন্ট্রোলিং অত্যন্ত উন্নতমানের; ছবি: trustedreviews.com

ক্যামেরাটির অটোফোকাস সেটিংস অত্যন্ত উচ্চমাত্রার। ৬১টি ফোকাস পয়েন্ট রয়েছে ঠিকভাবে অটোফোকাসিং করার জন্য। মেনুয়াল ফোকাসিং তো রয়েছেই, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন অটোফোকাসিং ছাড়াও এতে আরো বেশ কয়েক ধরনের অটোফোকাসিং সুবিধা রয়েছে।

ফোকাস নির্দিষ্ট হওয়ার পর ফোকাস লক সাথে সাথেই কাজ করে। মূল আইএসও স্পিড ১০০ থেকে ২৫,৬০০ হলেও প্রয়োজনে বৃদ্ধি করে ৫১,২০০ এমনকি ১,০২,৪০০ পর্যন্ত নেয়া যায়। বাউন্স ফ্ল্যাশ, আলোর স্বল্পতা ইত্যাদির উপর নির্ভর করে এই বৃদ্ধি আনা যায়। আইএসও স্পিড, শাটার স্পিড ইত্যাদির এক্সপোজার কন্ট্রোল ও কম্পেন্সেশন ঘটে।

টিএফটি কালারের একটি ৩.২ ইঞ্চি সাইজের এলসিডি লিকুইড ক্রিস্টাল মনিটর রয়েছে এই ক্যামেরায়। আর লাইট সেন্সরের সাহায্যে আলোর পরিবর্তনের সাথে ব্রাইটনেস সুবিধামত পরিবর্তিত হয়।

ভিডিও শ্যুটিং এর ক্ষেত্রে এই ক্যামেরা অত্যন্ত উন্নত ফিচার প্রদান করে থাকে। ১০৮০ পিক্সেল পর্যন্ত রেজোল্যুশনের ভিডিও শ্যুট করা যায় এই ক্যামেরা দিয়ে। বিভিন্ন সাইজের ভিন্ন ভিন্ন ফরম্যাটের ভিডিও ইচ্ছামতো শ্যুট করা যায় এবং এইচডি কোয়ালিটির ভিডিও তৈরি করা যায়। ভিন্ন কোয়ালিটি, সাইজ ও স্টোরেজের উপর নির্ভর করে কন্টিনিউয়াস শ্যুটিং টাইম ২৪-৬০ ফ্রেমস পার সেকেন্ড পর্যন্ত হতে পারে।

ক্যানন ইওএস ৫ডি মার্ক থ্রি বর্তমান প্রজন্মের মিররলেস ক্যামেরাগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা একটি ক্যামেরা। এর উন্নতমানের ফিচারসমূহ ও প্রযুক্তির কারণে ফটোগ্রাফারদের নিকট অনেক জনপ্রিয় এই ক্যামেরা। বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে এই ক্যামেরার মূল্য প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ক্যামেরার উচ্চ প্রযুক্তির কথা বিবেচনা করে এই মূল্য সাশ্রয়ী বলা চলে।

ফিচার ছবি- front.net

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *